Saturday, February 25, 2017

রুপকথা

রূপকথা ! 

যে বয়সে " ওরে বাবা, পৃথিবীটা এত্তো বড় নাকি ? " খুব স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন ! 
যে বয়সে আকাশের নীলিমায় আশ্রয় নেয়া সুবিশাল যান্ত্রিক দৈত্য পাখিটাকে মনে হয় ছোট্ট একটা ময়না ! 
যে বয়সে প্রচণ্ড ঝড়ের সময় বিজলির চমকে পাগলের মতন দোল খাওয়া নারিকেল গাছটাকে দেখে মনে হয় কি ভয়ঙ্কর ! কত্ত বড় হাঁ করে ! 

সেই বয়সে আমাদের প্রায় সবারই একটা করে কল্পনার সঙ্গী ছিল। 
কারও ছিল জিনি ! জাদুর জিনি ! জিনির কাছে মনে মনে যেটা চাওয়া হত জিনিটা সেটাই এনে দিত ! 
সিন্দাবাদের ভূতও কি মাথার পোকা কম নাড়াতো ? 
কারও কল্পনায় ছিল আলীবাবা ! চল্লিশ চোরের দলকে একাই নাস্তানাবুদ করে দিত ! ঘুমন্ত সুন্দরী বা সিন্ডারেলা ওই ছোট্ট অবস্থাতেই অনেকেরই ক্রাশ ছিল ! 
কেউ কেউ বা স্বপ্নে চলে যেত চাঁদের বুড়ির সাথে দেখা করতে ! 


" দাদী, ও দাদী, আরেকটা গল্প কও না ! " মীনার মত আমরাও কি ছোটবেলায় কম বায়না ধরেছি মুরুব্বিদের কাছে ? কতই না মজার ছিল সেই দিনগুলি, তাই না ? জানি, আজকের বাস্তবতায় বসে শৈশবের নানা রংয়ের দিনগুলির কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাসটা অনেকেই গোপন করেন। একটু খোলা আকাশ, বিশুদ্ধ বাতাসের নির্মলতা, মাটির সোঁদা গন্ধে উন্মুখ হয়ে ছুটে চলা ক্ষেতের আইল ধরে, দিগন্তের সূর্যটাকে খপ করে নিজের মুঠোয় ভরে নেয়া, দুপুরের তপ্ত রোদ গায়ে মেখে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পরে ডুব সাঁতারে একদমে অন্যপারে চলে যাওয়া এসবই এখন সোনালী অতীত ! 

ইচ্ছে করে, জানেন তো ? খুব ইচ্ছে করে ! যান্ত্রিকতার এই জঙ্গল ছেড়ে সবুজের মাঝে হারিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে কিচ্ছু ভালো লাগে না। একটানা কাজের ফাঁকে একটু ফুরসৎ পেলে তাই জানালাটা খুলে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি অপলক। মেঘের কোলে নিজেকে মেলে দিয়ে ভেসে বেড়ানো গাংচিলের ঝাঁক যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, 

" চলে এসো, জীবনের আহ্বানে ! "

একটু বেশীই নস্টালজিক হয়ে গিয়েছি আজকে। তাই আবেগটা একটু বেয়াড়া হয়ে গেছে। হয়তো ফিরে পাবো না সেই কোলাহল ! দল বেঁধে লুকোচুরি খেলা হবে না কোন বিষণ্ণ দুপুরে ! হওয়া হবে না কানামাছির চোর কিংবা বোম বাস্টিংয়ের টার্গেট ! 

' OLD SCHOOL 'র সাথে গলা মিলিয়ে তখন গাইতে ইচ্ছে করে......

" কেরে তুই, কেরে তুই 
সব সহজ শৈশবকে বদলে দিলি 
কিছু যান্ত্রিক বর্জ্যে 

তুই, কে রে তুই যত বিষাক্ত প্রলোভনে 
আমায় ঠেলে দিলি কোনো এক ভুল স্রোতে " 

কিন্তু এটা তো ঠিক সামনের অনাগত দিনগুলোতে এই স্মৃতির টনিকেই আমাদের অন্যমনস্ক মুহূর্তে ঠোঁটের কোনের এক চিলতে হাসিটা হয়ে উঠবে আরও প্রানবন্ত ! প্রাণোচ্ছল ! 

সেই এক চিলতে মুহূর্তের কামনায়......

Monday, February 13, 2017

তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম

হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম” বইয়ে পড়েছিলাম ”পাঁচ নীল পদ্ম থিওরী”। বইটার একটা জায়গায় লিখাছিলো, প্রত্যেকটি মানুষের কাছে কয়েকটি নীল পদ্ম থাকে, আর যখন কেউ কাউকে ভালবাসে তখন সে তার ভালবাসার মানুষটিকে সেই নীল পদ্ম গুলো দিয়ে দেয়। তার কাছে আর কোন নীল পদ্ম থাকে না, যদি না সেই মানুষটাও তাকে নীল পদ্ম দেয়। আবার একজনের দেয়া নীল পদ্ম কখনও অন্য কাউকে দেয়া যায় না। নীল পদ্ম দেয়ার পর কখনও সেটা ফেরতও পাওয়া যায় না।অদ্ভূত একটা থিওরী। আমি থিওরীর যথার্থতা যাচাই করতে পারবো না। এই রকম হাইপোথিটিক্যাল থিওরী বোধ হয় আপেক্ষিক । যাই হোক, ওর সাথে দেখা হবার আগে কলেজে থাকতে আমার এক ”জোৎস্না-বালিকা” ছিলো। জোৎস্না-বালিকা, নামটা ঠিক যাচ্ছে নাহ! দেখি, পরে যুতসঁই কোন নাম খোঁজে পাওয়া যায় কিনা। যা বলছিলাম, থিওরীটা যদি সত্যি হতো তবে আমি ওকে আর কোন পদ্ম দিতে পারতাম না।  কারণ আমার সব পদ্ম জোৎস্না বালিকার কাছে থাকার কথা। তবে এটাও হতে পারে যে, পাঁচটা পদ্মকে একসাথে না দিয়ে partially দেয়া যাবে। যখনই সংখ্যা চলে আসে তখনই সমীকরণ মিলাতে হয়। ওই ডানপক্ষ, বামপক্ষ - মাঝে সমান চিহ্ন বসাবার নিরন্তন চেষ্টা। এখন প্রশ্ন আসে কটা নীল পদ্ম কাকে দিয়েছি। ইদানিং মনে হয় আমার হাতে আমার নিজের আর কোন নীল পদ্ম নেই। কেউ যদি দিয়ে থাকে তবে সেটা অন্য কথা। যদিও সেই পদ্ম তো আমি আর কারো সাথে শেয়ার করতে পারবো না।  হিসেবটা বড়ই গুলমেলে। তবে assume করে নেয়া যেতে পারে। অনেক প্যাচাঁল পাড়লাম নীলপদ্ম নিয়ে। ও আমার নীল পদ্ম নিয়ে বসে থাক। আমিও ওর দেয়া নীলপদ্ম সযত্নে রেখে দিয়েছি। In fact নীল পদ্মটা একটা পুকুরে গেথে দিয়েছিলাম। ওই পুকুরে এখন নীল পদ্ম আর নীল পদ্ম। সকালে রোদ এসে পড়ে নীলপদ্মের উপর, ”পদ্মফুলে ভোমড়া খেলা করে”। আমার মন খারাপ হলেই আমি সেই পুকুরটার পাড়ে বসে থাকি। নীলপদ্মগুলোকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখি। অনেকটা ময়ূরাক্ষী নদীর মতো। পুকুরটা আছে, আর তোমার দেয়া পদ্মটাও আছে। আর তুমি? 
”তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম”। 

হুমায়ুন ফরীদি এক কিংবদন্তী


আজ ১৩ তারিখ, পহেলা ফাল্গুন, মনে আছে সব। সেইসাথে একজন মেধাবী মানুষকেও হারিয়েছিলাম ও বটে। কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল না, কারণ যারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবেন তারা সকলেই জানেন আজকের এই দিনে বাংলা চলচ্চিত্র এবং নাটক জগত কি বিশাল সম্পদ হারিয়েছিল। কিন্তু না লিখলে এক রকম অপরাধবোধ কাজ করছিল।
হ্যাঁ, আমি কান কাটা রমজানের কথাই বলছি। একজন সহজ সরল ভিলেন সাজা যে একজন ভাব মার্কা নায়ক হবার চেয়ে কতটা কঠিন তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানেন। এখনো মাঝে মাঝেই দেখি টুপি দাঁড়ি ওয়ালা পাক্কা বদমাইশের চেহারায় কুটিল মিচকা হাঁসিওয়ালা ফরিদী, “আমি তো পানি কিনি, পানি”। “দুধ দিয়া খাইবা না খালি খাইবা বাজান” মুখের ভাবের কত দ্রুত পরিবর্তন সফলভাবে আনতে পারতেন তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
একবার একজনকে বলেই ফেলেছিলাম Marlon Brando (Vito Corleone) কে হারিয়ে দেবার সব যোগ্যতা হুমায়ুন ফরীদির আছে, ।

অভিনয়জীবনের শুরু মঞ্চনাটকে অভিনয় ও নির্দেশনার মধ্য দিয়ে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি। সেলিম আল দীন রচিত ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘কীর্তনখোলা’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘হাত হদাই’র মতো ধ্রুপদি নাটকে অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হন। আশি ও নব্বই দশকে যে ক’জন অভিনয়শিল্পী মঞ্চ ও টিভি নাটককে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলেন, ফরীদি ছিলেন তাদের অন্যতম। যার এক বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবন ছিল।
চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি দেশ-বিদেশের লাখো-কোটি ভক্তের মনে আসন করে নিয়েছেন। হুমায়ুন ফরীদি সেই কিংবদন্তীর নাম ।
'আরও একটু না, আমি তো অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু তা তো সম্ভব না। তবে মানুষের জীবনযাপনে অদ্ভুত কিছু ভাবনা আসে। মহাভারতে ধর্ম যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞেস করেছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে আশ্চর্য জিনিস কী? যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষ এমনভাবে জীবন যাপন করে যেন সে মৃত্যুহীন। কিন্তু এই অমরত্ব তো লাভ করা সম্ভব না, এর জন্য আমার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু এই প্রত্যাশা কখনো পূরণ হবে না, কখনোই না। 'আচ্ছা মানুষ কি সত্যি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব? ---হুমায়ুন ফরীদি 

Sunday, February 12, 2017

দাগ

আচ্ছা মর্মর ধ্বনি কি একেই বলে? ওই যে শুকনো পাতার ওপরে হেঁটে গেলে যে ম্যাড়ম্যাড়ে আওয়াজটা হয়!! পাঁচ নম্বর ঘুষিটার সময় মাথার মধ্যে তেমন একটা শব্দ হলো; আর এখন ছয় নম্বরটার সময়ও। অদিতির হঠাতই হাসি পেল। সে কি করছে!!! ঘুষির সংখ্যা গুনছে...হা হা হা!!! আহসানের বাম হাত ওর গলা চেপে আছে আর ডান হাতি ঘুষিগুলো পড়ছে ওর বাম চোখে। অদিতিকে বিছানায় ফেলে বক্সিং প্রাক্টিস হচ্ছে; ও অবশ্য ওঠার চেষ্টা করছে না; জোর করে উঠতে গেলে গলায় আঙ্গুলের দাগ বসে যাবে গতবারের মতো। ও আর এখন ব্যথা পাচ্ছে না, শুধু মারটা শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করছে।

অদিতির ভাবনা শেষ হতে না হতেই আহসান ঘুষি বন্ধ করলো। ও উঠে বসলেও প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না; খালি অন্ধকার। “মা ও মাগো ...কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না যে...” অদিতির মা সেই কবেই মারা গেছেন অথচ কেন যে ও মাকে ডাকলো কে জানে। আহসানের গলায় বিদ্রুপ “ঢং করো নাতো...চোখে দেখবে না কেন??? তোমার ডান চোখেতো মারিনি...” বলতে না বলতেই অদিতি দেখতে পেল; মাথাটা ঘুরছে। মারের সময় চিন্তা হচ্ছিল; আটমাসের মেয়েটা বিছানায় ঘুমাচ্ছিলো। তাকাতেই দেখলো বাবুটার ঘুম ভেঙ্গেছে; দাঁত উঠবে; মুখে আঙ্গুল দিয়ে হাত লালায় মাখামাখি। মা তাকাতেই সে বিশাল একটা হাসি দিলো। অদিতি হাসি দেবার চেষ্টা করতেই বুঝতে পারলো চোখে তীব্র ব্যথা হচ্ছে; চোখের চারপাশের চামড়া তেলেভাজা লুচির মতো ফুলে উঠছে।

অদিতি জানে কি করতে হবে। সে এক দৌড়ে ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে চোখের ওপরে চেপে ধরলো। বরফের তা দিতে দিতেই ও বাথরুমে আয়নায় চোখের অবস্থা দেখতে গেলো। ইশশ রে...কি যে অবস্থা...যাকে বলে black eye…এইটাতো ঠিক হতে কম করে হলেও তিন থেকে ছয় মাস লাগবে। কালো দাগ আস্তে আস্তে নীল হবে, তারপরে গাঢ় হলুদ, তারপরে গাঢ় থেকে হালকা হলুদ মিলাবে ত্বকের বাদামীতে। আজ শনিবার; সোমবারে অফিসে যাবার আগে ঠিক হবার কোন সম্ভাবনাই নেই। এর মধ্যেই অদিতির মনে হলো “আচ্ছা black eye এর বাংলা কি হবে? কালো চোখতো অবশ্যই না...তাহলে নীলকালো চোখ...ব্যথিত কালো চোখ...” তক্ষুনি মাথার মধ্যে অরণীর রাগী রাগী কন্ঠ বলে উঠলো “তুমি না বড্ড ফালতু কথা ভাবো...আগে ভাবো আজ রাতের দাওয়াতের কি হবে? তারপরে ভাবো অফিসে কি বলবে?” অরনীটা না খুব টেনশন করায়। আয়নায় তাকিয়ে অদিতি ফিসফিসিয়ে বললো “ছোট বাচ্চা থাকার অনেক সুবিধা...আজ আমি দাওয়াতে যাবো না...আহসানকে পাঠিয়ে দেব...বললেই হবে যে বাবুর জ্বর এসেছে...এই ভাবী যা গসিপ করেন...দেখা হলে খবর চারিদিকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে যাবে...কিছুদিন সামাজিকতা এড়িয়ে চলতে হবে...”

সন্ধ্যায় আহসান বের হতেই বাবুকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে ও আয়নার সামনে। দেখা যাক মেকাপ দিয়ে ব্যথিত কালো চোখের ব্যথা কতোটা আড়াল করা যায়!!! চোখের আসলেই বীভৎস অবস্থা; ভুরুর নীচে একটু কেটেছেও; চোখটা ফুলে ছোট হয়ে গেছে। অদিতির আবারো হাসি পেলো; ওকে দেখাচ্ছে র‍্যাম্বোর মতো...Lady Rambo। সব মজার সময় গুলোতেই অরণী কথা বলে ওঠে “শোনো মেয়ে এইসব ফাজলামি কথা না ভেবে আগে ভাবো অফিসে কি বলবে? Domestic abuse সন্দেহ হলেইতো বস প্রথমে Human Resources কে ডাকবে আর জেরার পরে ধরা খেলে পুলিশ হাজির...” অদিতি দ্রুত ভাবতে থাকে “একটা বলা যায় যে বাবু চোখে খেলনা দিয়ে জোরে মেরেছে...কিন্তু বাচ্চা মানুষ এত্তো জোরে মেরেছে কেউ বিশ্বাস করবে না...হুউউ তাহলে মাইনর কার অ্যাক্সিডেন্ট...তাওতো আবার কার ড্যামেজ নেই...ইন্স্যুরেন্স পেপারস???” “তাহলে কিচেন ফ্লোর ক্লিনিংয়ের সময় পা পিছলে গেছে...চোখ গিয়ে লেগেছে কাউন্টারের ধারালো করনারে...হুউউ এটা হতেও পারে...” অফিসে গিয়ে অদিতি বলবে “পা পিছলে আলুর দম”; ওর আবারো হাসি পাচ্ছে।

আহসানের দাওয়াত থেকে আসতে বেশ রাত হবে; অদিতি বাবুকে আরেকবার খাইয়ে রাতের মতো ঘুম পাড়িয়ে দিলো। একা একা টিভি দেখার সময় ও হঠাৎই আতঙ্কে জমে গেলো; আজ যদি ও অদিতিকে চায়। চাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী; আদর করতে করতে বলবে সে সরি...আর হবে না...কিন্তু অদিতি কেন ওকে রাগায়...এত্তো তর্ক করে!!! আগের সব বারেই তাই ঘটেছে। ও ফিসফিস করে বললো “শোনো অরণী ওই সময়টা আমার সাথে থেকোতো...একটু কথা বোলো...” রাতে বিছানায় আহসান কাছে টানতেই অদিতি শক্ত হয়ে গেলো; ভাগ্যিস অন্ধকার; নাহলে আহসান দেখতে পেতো যখন চুমু দিচ্ছে অদিতির বমি বমি লাগছে। অদিতির ইচ্ছে না করলেও মানা করার সাহস নেই; ও আহসানকে প্রচন্ড ভয় পায়।

অদিতির শরীরে সুখ খুঁজতে ব্যস্ত আহসান; ও নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলো আহসান কি জানে যে শরীরে ভালোবাসাও থাকে? আদরের একসময়ে অদিতি সাহস করে বললো “শোনো এরপরে থেকে মারলে পিঠে বা শরীরে মেরো...হুউউ...মুখে মেরো না প্লিজ...” বলতেই মাথার ভেতরে অরণী বলে উঠল “তুমি মরবে মেয়ে...making a deal with the devil…বাইরে দেখো রুপালী জোছনার কাফন...ঠিক এমনই দুধ সাদা কাফনে মুড়বে তুমি...” অদিতি মনে মনে প্রচন্ড হেসে উঠলো “বোকা মেয়ে...তুই কি আসলেই জানিস না??? আমিতো সেই কবেই মরে গেছি...কবেই

Thursday, February 2, 2017

জোনাকিরা দীপ জ্বেলে যায়

গল্প শুনতে চান। আমি আসলে ভালো গল্পকার কিংবা বক্তা নয়। আমার গল্প আপনার শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে। তবুও বলি। আমার গল্প বলি, ঠিক আমার না আমার আর আমার ছোটবোনের গল্প। কত ছিলো তখন ওর বয়স, এই ৪/৫ হবে আর আমি ১৪/১৫ বছরের বালক। আমাদের বাসাটা ছিলো একটু নিরিবিলিতে ছোট্ট সুন্দর ছিমছাম। বাইরে বিরাট উঠান। বাবা সেনাবাহিনির কর্মকর্তা বলে বাসায় আসতে পারতেন কদাচিৎ। আম্মাও চাকরী করতেন দুরের একটা স্কুলে। আমি আর ও সারাদিন ছুটে বেড়াতাম। মালা-ঠুলি খেলতাম। আমি যখন স্কুল কিংবা অন্য কোথাও থেকে আসতাম ও ছুটে এসে আমার ঘাড়ে ঝাপিয়ে পড়ত। তারপর ওকে নিয়ে আমার বিমানের মত শোঁ শোঁ শব্দ করে ছুটে চলতে হতো। আর ও আমার গলা ধরে ঝুলে থেকে খিল খিল করে হাসতো। এখনো পরিবর্তন হয়নি কিছুই, আমি বাড়ির কাছে গেলেই ওর দুষ্টুমাখা প্রানোচ্ছল হাসি শুনি। আর ওর আবদার ছিলো আমার কাছে শুধু ক্যান্ডি। আমি ওর জন্য ক্যান্ডির বক্স নিয়ে আসতাম মাঝে মাঝে। তাই বাড়িতে ফিরলে ওর জিজ্ঞাসা ছিলো, “দাদাভাই চক্কেট এনেছো?” কখনো সে এটা বাবা কিংবা মায়ের কাছে চায়নি। হয়তো ভাবতো আমিই শুধুমাত্র পারি চকলেট আনতে।

বাবার আসার কথা ছিলো এই ছুটিতে। আমি আর ও মহা খুশি ছিলাম। দুজনে ব্যস্ত ছিলাম কিভাবে বাবাকে চমকে দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের চমকাতে হলো জেনে যুদ্ধ শুরুর কারনে বাবা আসতে পারবেন না। ও মিষ্টি গলায় যুদ্ধের প্রতি অভিমান নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো- “দাদাভাই দুদ্ধ কি?” আমি গর্ব করে বলেছিলাম “খারাপ মানুষকে জোর করে তাড়িয়ে দেওয়ার নাম যুদ্ধ।” মুষড়ে পড়া আমাদের স্বান্তনা দিয়েছিলেন আম্মা এই বলে যে, “যখন তোদের বাবা জয়ী হয়ে আসবে তখন কত আনন্দ হয় দেখিস” আম্মার চোখে অন্য কিছু ছিলো বলে এই অপ্রত্যাশিত আনন্দের জন্য আমার অপেক্ষা বেদনাদায়ক ছিলো।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেও আমাদের জীবন খুব একটা পরিবর্তন হয়েছিলো না। তবে যখন থেকে আকাশে বিমান উড়া শুরু করলো তখন থেকে বিমান আকাশে আসলেই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হতো। যা একটা সাইরেন বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো। ওর আশ্রয়কেন্দ্র মোটেই পছন্দের ছিলোনা। পছন্দ হওয়ার মত যায়গাও না, ছোট ঘিঞ্জি জানালাবিহীন একটা ঘরে অসংখ্য মানুষ।
সেদিনো এরকম একটা দিন ছিলো। আম্মা আমাকে বললেন ছোট বোনকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে কারন সাইরেন বাজতে শুরু করেছে। আর উনি যাবেন কিছু টাকা উঠাতে এবং বাবাকে টেলিগ্রাম করতে। আমার কাছে সবকিছু দিয়ে উনি চলে গেলেন। আমি আমার ছোটবোনকে কাঁধে নিয়ে ছুটলাম আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। ততক্ষনে চলে এসেছিলো মরনঘাতি বিমান। যা শাঁই শাঁই করে উড়ছিলো আর গুলি এবং বোমা আতঙ্কিত মানুষকে উপহার দিচ্ছিলো। আমি অনেক কষ্টে পৌঁছুতে পেরেছিলাম আশ্রয়কেন্দ্রে। পৌঁছায়েই খোঁজ নিয়েছিলাম আম্মা পৌঁছিয়েছেন কিনা। যখন তার খোজঁ পেলাম সেটা নিথর দেহ ছাড়া কিছু ছিলোনা। অনেকগুলা নিথর দেহের সাথে তার অবস্থান হলো গনকবরে। আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম, বরঞ্চ ভয় পাচ্ছিলাম ছোটবোন জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দেব। সন্ধ্যার কাছাকাছি আম্মাকে বিদায় জানিয়ে যখন আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরেছিলাম, তখন আমার ছোটবোন জিজ্ঞাসা করলো আম্মা কোথায় সে আম্মার কাছে যাবে। আমি তাকে আম্মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে বলেও নিবৃত করতে পারলাম না, সে গাল ফুলিয়ে বসে থাকলো আশ্রয়কেন্দ্রের নির্জন কোনে। যখন আমি আম্মার আংটি তাকে দিয়ে সযতনে রাখতে বললাম যা দিয়ে আমি সনাক্ত করতে পেরেছিলাম ঐটায় আমার আম্মা, সে কিছুটা খুশি হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আম্মা তাকে ঐটা দিয়ে দিয়েছি কিনা উপহার হিসাবে। আমি কান্না সংবরন করে মাথা ঝাকিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলাম হ্যা তবে যত্নে রাখতে হবে সেই শর্তে। ও খুশি হয়ে নিবিড় মমত্বে তার পোষাকে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট ব্যাগে রেখে দিয়েছিলো।

ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে চাচ্ছিলো না। আর তাছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র পরিপুর্নভাবে থেকে যাওয়ার মত স্থান ও ছিলো না। তাই একদিন রেশন হিসাবে পাওয়া একটি কম্বল এবং বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সাথে নিয়ে আসা কিছু জিনিষপত্র সঙ্গে করে শহরের নির্জন পাশে নদীর কোনে ভেঙ্গেচুরে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িতে উঠেছিলাম। সাজিয়ে নিয়েছিলাম নিজদের মত করে। কিছুটা হয়তো ভুলতে চেয়েছিলাম আমাদের ভস্মিভুত হওয়া বাড়ির কথা। রেশনে পাওয়া বিস্কুট খেয়েও আমরা কিছুটা তৃপ্ত ছিলাম। নদীতে গোসল করতে যেয়ে কথা দিয়েছিলাম যুদ্ধ থামলে ওকে সাঁতার শিখিয়ে দিব। রেশন ফুরিয়ে গিয়েছিলো অল্প কিছুদিনেই। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম সেটা আসতে আরো কয়েকমাস লাগবে। তখন এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকে খাবার চেয়ে চিন্তে নিয়ে আসতাম কিংবা জীবনের ঝুকি নিয়ে, যখন সবাই সাইরেনের শব্দে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে যেত আমি তাদের বাড়ি থেকে খাবার চুরি করে নিয়ে আসতাম। এতে একবেলা দুইবেলা খাবার জুটত বইকি বেশিরভাগ সময় ক্ষুদার্ত পেট জানান দিতো তার কথা। ব্যাং শামুক খেয়ে বেঁচে থাকার কিংবা ছোটবোনকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। এসব চেষ্টা সবসময় সফল হতো তা না। যখন ব্যর্থ হতো তখন ছোটবোনের কান্না থামাতে তাকে আমি নিয়ে যেতাম নদীর পাশেই জোনাকিদের মেলায়। অসংখ্য জোনাকি মিটি মিটি করে জ্বলা নিভা ওর খুব ভালো লাগতো। ও ছুটে বেড়াতো তাদের মাঝে। আমি ওকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম কিভাবে জোনাকি মুঠোবন্দি করলে হাত রক্তিম হয়ে উঠে। একদিন আমি আর ও অসংখ্য তারার মত জ্বলতে থাকা জোনাকিদের ঘরে নিয়ে এসেছিলাম স্বচ্ছ কাচের বোতলে বন্দি করে। সেদিন সকালে আবিস্কার করেছিলাম আমার ছোটবোন কবর দিচ্ছে জোনাকিদের একসাথে। আমাকে দেখে ও বললো “দাদাভাই মরে গেলে কবর দিতে হয়, তাই না? যেমন আম্মাকে দেওয়া হয়েছিলো”। আমি কষ্ট এবং অবাক হয়ে পরে জেনেছিলাম ও আম্মার মৃত্যুর সংবাদ জেনেছিলো আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার সময়েই।

হঠাৎ করেই ও অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডায়রিয়া। খুব নেতিয়ে পড়েছিলো আমার বোনটি। আমি ওর জন্য ডাব চুরি করতে যেয়ে মার খেয়ে ফিরে আসার পর আমার রক্তাক্ত মুখ দেখে বলেছিলো “দাদাভাই খুব ব্যথা লাগে? চল দাক্তালেল কাছে নিয়ে যায়”। আমি ঐদিনি খুব জোরে কেঁদে উঠেছিলাম আমার প্রাণপ্রিয় ছোটবোনটাকে জড়িয়ে ধরে। দুই ভাইবোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ক্ষুদার্ত পেট নিয়ে বসেছিলাম সারা রাতটি ধরে, যেন একে অন্যকে ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো।

শহরে যেয়ে দেখলাম ব্যাঙ্ক খুলেছে আম্মার সই করা ব্যাঙ্কের চেক নিয়ে টাকা উঠাতে যেয়ে শুনলাম যুদ্ধ শেষ। আমাদের আশু শুভসংবাদে খুশি হয়ে উঠেছিলাম। বাজার থেকে কিনেছিলাম চিকন চাল, ওর প্রিয়ফলগুলো। নির্জন বাড়িটাতে এসে দেখি চুপচাপ শুয়ে আছে আমার ছোট্ট প্রিয় বোন প্রায় কঙ্কালসার দেহ নিয়ে। ওকে খুশির সংবাদ আর প্রিয় ফল ধরিয়ে দিয়ে বললাম খেতে থাক এখুনি ভাত রান্ন হয়ে যাবে। তোর প্রিয় মুরগী এনেছি গরম ভাতের সাথে খাবি। ওর মুখে হাসি ফুটে উঠেছিলো কিন্তু হাত দিয়ে খাওয়ার মত শক্তি অবশিষ্ট ছিলোনা। আমি কিছুটা ফল ওর মুখে দিয়ে রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যখন সুঘ্রাণে চারিদিক ময় ময় করছিলো আমি বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিলাম গরম ভাতের তখন আমি চাচ্ছিলাম আমার বোনটাও নিক এই সুঘ্রাণ। ওকে ভিতর থেকে নিয়ে আসতে যেয়ে দেখি ও পড়ে আছে নিথর, ওর ফলগুলো পড়ে আছে পাশেই, কিছু মাছি উড়াউড়ি করছে তার চারপাশে।

আজ আমি ওর কাছে চলে এসেছি মায়ের শেষ কথানুযায়ি ওকে দেখে রাখতে। ও এখনো ছেলেমানুষ। এখনো আমার কাধে ভর দিয়ে ঘুরে বেড়াই আর রাত হলে জোনাকিদের পিছে লাগে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ও নয় যেন জোনাকিগুলো ওর পিছু নিয়েছে।

উৎসর্গঃ যুদ্ধপিড়িত শিশুদের, যাদের কাছ থেকে ক্ষমতালোভি মানুষেরা শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে এবং নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ফুটনোটঃGrave of the Fireflies সিনেমাটা অবলম্বনে।

প্রলাপ

- আম্মু এই মানুষটা এমন কেন?
- বাবা কাছে যেয়ো না...ও মানুষ না...পাগল!!

মা ছেলের কথা শুইন্যা অনেক কষ্টে একটু চোখ মেইলা দ্যাখলাম। স্কুলডেরেস পইরা একটা চার পাঁচ বছরের ছুট্টু ছেলে মায়ের সাথে হাইটা যাইতাছে। গলির মাথায় স্কুলের মর্নিংশিফট মনে হয় শ্যাষ; তার মানে এগারটা বাইজা গ্যাছে। ঘুম আগেই ভাঙ্গছে; শীতের সকালের রোদ গায়ে পড়লে ঘুমাইতে খুবই আরাম। 

মাথার এই বেজন্মা উকুন গুলির জ্বালায় ঘুম নষ্ট। রোদের তাপে মাথা জুইড়া এমন কামড়াকামড়ি লাগায় যে ঘুমানো কঠিন। মাথাডা আরাম কইরা চুলকাইতেও পারি না; লম্বা চুলে এমুন জট লাগছে যে আঙ্গুল দেয়া যায় না। সেদিন রাস্তা থেইক্যা একটা আইসক্রীমের কাঠি যোগাড় করেছিলাম। কই যে গেলো? 

এইইই তো...উহহহ মাথা চুলকাইতে যে কি আরাম!!! শালা এই উকুন গুলা আমার রক্তে খাইয়া যে কি মজা পায় কে জানে? বেশীর ভাগ দিনতো তিনবেলা খাওয়াই জুটে না...রক্তে কুন ভাইটামিনতো পাওয়ার কথা না। তবে যাদের রক্ত চোষার অভ্যাস তারা আমার মতো গরীব মানুষের রক্তই বেশী বেশী খায়!!! উকুনের আর কি দোষ? 

মাথাটা কামায়ে ফেলতে পারলে ভালো হইতো; উকুনের জ্বালায় আর ভালা লাগে না। শীতটা কমলেই মাথা বেল কইর‍্যা ফেলমু। চুল কেন...মাঝে মাঝেতো ইচ্ছা করে মাথাটাই কাইট্যা ফেলতে। এখুনতো শুনি চুলকাটার জইন্য নাপিতের মতো মাথা কাটার জইন্যও লোক পাওয়া যায়। তবে পাগলের মাথার আর কি দাম? দামী মাথা হইলে নিশ্চয়ই কাটার জইন্য লোকে এমনিতেই আয়া পড়তো। 

আজ কি খাওয়া পামু কিনা কে জানে? মসজিদের সামনে অবশ্য খাবার আর ভিক্ষা না চাইতেই পাওয়া যায়। রাস্তার ওই পাশেই মসজিদ; মসজিদের নামাজের জায়গা বাড়াইতাছে। বৃষ্টির মওসুম থেইকাই ইটা বালু রড সুরকি আইন্যা আশেপাশে ফালাইয়া রাখছে। ভালোই করছে; ইটের পাজার ওপরে এই ঠাণ্ডায় একটু আরাম কইরা ঘুমানো যাইতাছে।

এই জায়গাতে ফকিরের আসাযাওয়াও বেশী, বিশেষ কইরা শুক্রবারে জামাতের দিনে। ভিক্ষুকরা জায়গা নিয়া ক্যাচাল করলেও আমারে কেউ ঘাটায় না...পাগল হইবার এই এক সুবিধা!!! তবে মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। আগে আমার সাথে এইখানে আরেকটা পাগলও থাকতো। ব্যাটা সারাদিন বিড় বিড় কইরা বলতো “আম জা্ম আম জাম”; কে জানে ক্যান? আম জাম না খাইতে পাইয়া পাগল নাকি ফরমালিন দেয়া আম জাম খাইয়া পাগল কে জানে!! আর জানমুই বা ক্যামনে? সে খালি বলে “আম জাম” আর আমারতো কথাই বন্ধ। “আম জাম” মাঝে মাঝেই চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতো; বেশ ভালোই করতো; জ্যাম থাকলেও ছুইট্যা যাইতো। একদিন কোত্থনে পুলিশ আইস্যা ধইরা লইয়া গেলো। আরে বেকুব ঠোলারা...এই শহরে সব রিক্সা গাড়ী যখন পাগলের মতো চলে তখন পাগলের চেয়ে ভালো ট্রাফিক কন্ট্রোল আর কে করতে পারে? 

ধুর!!! হাসি পাইতাছে যে...হা হা হা!!! আচমকা হাইসা উঠতেই দুজন পথচারী লাফ দিয়া সইরা গেলো। হা হা হা!!! এদের দেখি ভয়ে চোখ মুখ শুকায়ে গ্যাছে; ব্যাটাদের ভয় দেইখ্যা আরো বেশী হাসি আসতেছে...পাগলের চীৎকারের চাইয়া যে পাগলের হাসি বেশী ডরাওলা তা আমি জানি...ক্যান কে জানে? আমিতো কখনো কাউরে বকি নাই, তাড়াও করি নাই। শুধু আমার কথা কইতে ইচ্ছা করে না, খুবই ক্লান্ত লাগে, মনে হয় কথা কইয়া কি হবে? কুন মানে নাই যে...অর্থহীন!!! পাগলে কি না কয় আর ছাগলে কি না খায়?

তবে কাউরে তাড়া করি নাই এই কথাও পুরাপুরি ঠিক না। মামারে বটি নিয়া তাড়া করালাম বইলাইতো লঞ্চে কইরা গেরাম থেইকা এই শহরে রাইখা গেলো। তাড়া করুম না? মামা্রে আইসা লোকমান মিয়া বলে “আহারে পুলাটার জবান এখুনো বন্ধ...কি মনে হয়? আর কথা কইবো না?” মামা কিনা তারে কয় “আর কইয়ো না...এই গোলমালের সুময় আমার বুন, বুন জামাইরে এত্তটুক ছেলের সামনে কুপাইয়া মারছে...ভয়ে কথা বন্ধ মনে হয়।“ “গোলমাল” কথাটা শুইনাই আমার মাথাটা গরম হয়া গেলো; আব্বা সবসময় গ্রামের সবাইরে বলতেন “খবরদার!! গোলমাল বলবা না, মুক্তিযুদ্ধ বলবা। এখন আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ চলতেছে।“ মামী উঠানে বটি দিয়া রান্নার কাটাবাছা করতেছিলেন। আর কিছু না পাইয়া সেইটা নিয়াই মামারে দৌড়ানি দিলাম; খালে নিয়া ফেলছিলাম।

হা হা হা!!! মামার চেহারাটা মনে কইরা আবারো হাসি আসতেছে। তবে মামা মামী এমনিতে অনেক আদর করতো। আরেকবার যে কুদ্দুস মিয়ারে দা নিয়া তাড়া করছিলাম তখন কিন্তু গ্রামের লোকে বললেও মামা মামী ঘর থেকে বাইর কইরা দেয় নাই। কুদ্দুস মিয়া!!! মনে কইরাই আবার মাথাটা আউলা হইয়া যাইতাছে। সে কি ভাবছে আমি দেখি নাই, আমি জানি না। পাকসেনাদের আমাদের বাসায়তো সেই নিয়া আসলো; মা বলাতে আমি তাড়াতাড়ি শোয়ার ঘরের আলমারিতে লুকাইলাম। 

অনেক আগে আমাদের গেরামে একটা গরু মরছিলো; আর শকুনের দল কুথা কুথা থেইকা আইসা মরা গরুটার ওপরে হামলায়ে পড়ছিলো। বিছানায় মায়ের ওপরে ওই পাকিস্তানী মিলিটারীরা ঠিক তেমনি হামলায়ে পড়ছিলো; ছিঁড়া খুইড়্যা খাওয়া শ্যাষে বেয়োনেট দিইয়া খুঁচায়া খুঁচায়া মায়েরে মারলো। বাবারে শোয়ার ঘরেই চেয়ারের সাথে বাইন্ধ্যা রাখছিলো; মাঝে মাঝে রাইফেলের বাট দিয়া মারতেছিলো। বাবা মা প্রথমদিকে চীৎকার করতেছিলেন কিন্তু একটু পরে দুইজনেই চুপ কইরা গেলেন। আমি জানি ক্যান? আমি জানিইইইই...প্রান ভিক্ষা চাইলে কাকুতি মিনতি করলে ওই বেজন্মাগুলার আনন্দ আরও বাইড়া যায়। ভয় যদি চোখে না দেখা যায়, কাকুতি যদি শোনা না যায়, তবে অত্যাচারের মজা কই? 

আমি নিজের মুখ নিজে চাইপা ধইরা ছিলাম; চীৎকার যেন না হয়!!! মা আগেই বইলা দিছিলো। মা আর বাবারে মারার পরে সেই কুদ্দুস মিয়া সারা বাড়ী আমারে খুঁজছে; না পায়া শ্যাষে ভাবছে আমি বুঝি বাসায় নাই। হা হা হা!!! শালা বাঞ্চোত ভাবছে আমি জানি না, আমি দেখি নাই। 

ব্যাটা হারামীর বাচ্চা মামারে আইস্যা বলে “মাসুম বাচ্চাটার এই দশা কে করলো? কথা বন্ধ...আহারে” সাথে আবার শালা চুক চুক আওয়াজও করে। দিলাম দা নিয়া দৌড়ান; প্রথমে যখন তার কাছে দা পিছুনে লুকাইয়া আউগাইছি সে বুঝে নাই...হাসিমুখে বলে “কেমুন আছো বাজান?” যখন দা দিয়া কোপ দিতে নিছি সে “ওরে বাবারে মারে...আমারে মাইরা ফেললো রে” কইয়া দৌড়...পিছে পিছে আমিও দৌড়। ব্যাটার চেলা চামুন্ডারা অবশ্য মাঝ রাস্তাতেই আমারে কব্জা করে ফালাইছিলো.....যত্তোসব!! মজাই নষ্ট!!! ইশশ রে এই একটা কারনেই গেরাম ছাইড়া আসার জন্য আফসুস হয়...গেরামে থাকলে মাঝে মাঝে কুদ্দুস আর তার মতো রাজাকারগো দৌড়ানি দিতে পারতাম। আমি ছাড়াতো গেরামে সব সুস্থ মানুষ; পাগল ছাড়া রাজাকারগো এই দ্যাশে কেউ দৌড়ানি দেয় না যে!!!

আমি কথা কই না সেই কবে থেইকা...কত্তোদিন হয়া গেলো দ্যাশ স্বাধীন হইলো...কিন্তু আসলেই কি হইলো? তাইলে কুদ্দুস মিয়ার মতো পশুগুলা বাইরে মুক্ত ঘুরে ক্যামনে? আমারে না কেউ জিগায় নাই সেইদিন কে আমার বাবা মারে মারছিলো? যে দিন কেউ আমারে জিগাবে সেই দিন আমি কথা কমু...কিন্তু আমারে কেউ জিজ্ঞাসা করে না ক্যান? সবাই কি তাইলে সব জানে? আর জাইনাও না জানার ভান করে? দ্যাশের মানুষগুলা কবে আমার মতোন পাগল হবে?

সেরা

প্রজেক্ট উবামেসেলিস

শুরু আগে ড. নিলান ডাস্টি নিজের সব শক্তি ব্যয় করে দৌড়াচ্ছে । চাঁদের আলোতে পথ দেখতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না । অভ্যাস না থাকার কারনে ...

জনপ্রিয়