Thursday, February 2, 2017

জোনাকিরা দীপ জ্বেলে যায়

গল্প শুনতে চান। আমি আসলে ভালো গল্পকার কিংবা বক্তা নয়। আমার গল্প আপনার শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে। তবুও বলি। আমার গল্প বলি, ঠিক আমার না আমার আর আমার ছোটবোনের গল্প। কত ছিলো তখন ওর বয়স, এই ৪/৫ হবে আর আমি ১৪/১৫ বছরের বালক। আমাদের বাসাটা ছিলো একটু নিরিবিলিতে ছোট্ট সুন্দর ছিমছাম। বাইরে বিরাট উঠান। বাবা সেনাবাহিনির কর্মকর্তা বলে বাসায় আসতে পারতেন কদাচিৎ। আম্মাও চাকরী করতেন দুরের একটা স্কুলে। আমি আর ও সারাদিন ছুটে বেড়াতাম। মালা-ঠুলি খেলতাম। আমি যখন স্কুল কিংবা অন্য কোথাও থেকে আসতাম ও ছুটে এসে আমার ঘাড়ে ঝাপিয়ে পড়ত। তারপর ওকে নিয়ে আমার বিমানের মত শোঁ শোঁ শব্দ করে ছুটে চলতে হতো। আর ও আমার গলা ধরে ঝুলে থেকে খিল খিল করে হাসতো। এখনো পরিবর্তন হয়নি কিছুই, আমি বাড়ির কাছে গেলেই ওর দুষ্টুমাখা প্রানোচ্ছল হাসি শুনি। আর ওর আবদার ছিলো আমার কাছে শুধু ক্যান্ডি। আমি ওর জন্য ক্যান্ডির বক্স নিয়ে আসতাম মাঝে মাঝে। তাই বাড়িতে ফিরলে ওর জিজ্ঞাসা ছিলো, “দাদাভাই চক্কেট এনেছো?” কখনো সে এটা বাবা কিংবা মায়ের কাছে চায়নি। হয়তো ভাবতো আমিই শুধুমাত্র পারি চকলেট আনতে।

বাবার আসার কথা ছিলো এই ছুটিতে। আমি আর ও মহা খুশি ছিলাম। দুজনে ব্যস্ত ছিলাম কিভাবে বাবাকে চমকে দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের চমকাতে হলো জেনে যুদ্ধ শুরুর কারনে বাবা আসতে পারবেন না। ও মিষ্টি গলায় যুদ্ধের প্রতি অভিমান নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো- “দাদাভাই দুদ্ধ কি?” আমি গর্ব করে বলেছিলাম “খারাপ মানুষকে জোর করে তাড়িয়ে দেওয়ার নাম যুদ্ধ।” মুষড়ে পড়া আমাদের স্বান্তনা দিয়েছিলেন আম্মা এই বলে যে, “যখন তোদের বাবা জয়ী হয়ে আসবে তখন কত আনন্দ হয় দেখিস” আম্মার চোখে অন্য কিছু ছিলো বলে এই অপ্রত্যাশিত আনন্দের জন্য আমার অপেক্ষা বেদনাদায়ক ছিলো।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরেও আমাদের জীবন খুব একটা পরিবর্তন হয়েছিলো না। তবে যখন থেকে আকাশে বিমান উড়া শুরু করলো তখন থেকে বিমান আকাশে আসলেই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হতো। যা একটা সাইরেন বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো। ওর আশ্রয়কেন্দ্র মোটেই পছন্দের ছিলোনা। পছন্দ হওয়ার মত যায়গাও না, ছোট ঘিঞ্জি জানালাবিহীন একটা ঘরে অসংখ্য মানুষ।
সেদিনো এরকম একটা দিন ছিলো। আম্মা আমাকে বললেন ছোট বোনকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে কারন সাইরেন বাজতে শুরু করেছে। আর উনি যাবেন কিছু টাকা উঠাতে এবং বাবাকে টেলিগ্রাম করতে। আমার কাছে সবকিছু দিয়ে উনি চলে গেলেন। আমি আমার ছোটবোনকে কাঁধে নিয়ে ছুটলাম আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। ততক্ষনে চলে এসেছিলো মরনঘাতি বিমান। যা শাঁই শাঁই করে উড়ছিলো আর গুলি এবং বোমা আতঙ্কিত মানুষকে উপহার দিচ্ছিলো। আমি অনেক কষ্টে পৌঁছুতে পেরেছিলাম আশ্রয়কেন্দ্রে। পৌঁছায়েই খোঁজ নিয়েছিলাম আম্মা পৌঁছিয়েছেন কিনা। যখন তার খোজঁ পেলাম সেটা নিথর দেহ ছাড়া কিছু ছিলোনা। অনেকগুলা নিথর দেহের সাথে তার অবস্থান হলো গনকবরে। আমি কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম, বরঞ্চ ভয় পাচ্ছিলাম ছোটবোন জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দেব। সন্ধ্যার কাছাকাছি আম্মাকে বিদায় জানিয়ে যখন আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরেছিলাম, তখন আমার ছোটবোন জিজ্ঞাসা করলো আম্মা কোথায় সে আম্মার কাছে যাবে। আমি তাকে আম্মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে বলেও নিবৃত করতে পারলাম না, সে গাল ফুলিয়ে বসে থাকলো আশ্রয়কেন্দ্রের নির্জন কোনে। যখন আমি আম্মার আংটি তাকে দিয়ে সযতনে রাখতে বললাম যা দিয়ে আমি সনাক্ত করতে পেরেছিলাম ঐটায় আমার আম্মা, সে কিছুটা খুশি হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আম্মা তাকে ঐটা দিয়ে দিয়েছি কিনা উপহার হিসাবে। আমি কান্না সংবরন করে মাথা ঝাকিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলাম হ্যা তবে যত্নে রাখতে হবে সেই শর্তে। ও খুশি হয়ে নিবিড় মমত্বে তার পোষাকে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট ব্যাগে রেখে দিয়েছিলো।

ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে চাচ্ছিলো না। আর তাছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র পরিপুর্নভাবে থেকে যাওয়ার মত স্থান ও ছিলো না। তাই একদিন রেশন হিসাবে পাওয়া একটি কম্বল এবং বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সাথে নিয়ে আসা কিছু জিনিষপত্র সঙ্গে করে শহরের নির্জন পাশে নদীর কোনে ভেঙ্গেচুরে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িতে উঠেছিলাম। সাজিয়ে নিয়েছিলাম নিজদের মত করে। কিছুটা হয়তো ভুলতে চেয়েছিলাম আমাদের ভস্মিভুত হওয়া বাড়ির কথা। রেশনে পাওয়া বিস্কুট খেয়েও আমরা কিছুটা তৃপ্ত ছিলাম। নদীতে গোসল করতে যেয়ে কথা দিয়েছিলাম যুদ্ধ থামলে ওকে সাঁতার শিখিয়ে দিব। রেশন ফুরিয়ে গিয়েছিলো অল্প কিছুদিনেই। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম সেটা আসতে আরো কয়েকমাস লাগবে। তখন এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকে খাবার চেয়ে চিন্তে নিয়ে আসতাম কিংবা জীবনের ঝুকি নিয়ে, যখন সবাই সাইরেনের শব্দে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে যেত আমি তাদের বাড়ি থেকে খাবার চুরি করে নিয়ে আসতাম। এতে একবেলা দুইবেলা খাবার জুটত বইকি বেশিরভাগ সময় ক্ষুদার্ত পেট জানান দিতো তার কথা। ব্যাং শামুক খেয়ে বেঁচে থাকার কিংবা ছোটবোনকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। এসব চেষ্টা সবসময় সফল হতো তা না। যখন ব্যর্থ হতো তখন ছোটবোনের কান্না থামাতে তাকে আমি নিয়ে যেতাম নদীর পাশেই জোনাকিদের মেলায়। অসংখ্য জোনাকি মিটি মিটি করে জ্বলা নিভা ওর খুব ভালো লাগতো। ও ছুটে বেড়াতো তাদের মাঝে। আমি ওকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম কিভাবে জোনাকি মুঠোবন্দি করলে হাত রক্তিম হয়ে উঠে। একদিন আমি আর ও অসংখ্য তারার মত জ্বলতে থাকা জোনাকিদের ঘরে নিয়ে এসেছিলাম স্বচ্ছ কাচের বোতলে বন্দি করে। সেদিন সকালে আবিস্কার করেছিলাম আমার ছোটবোন কবর দিচ্ছে জোনাকিদের একসাথে। আমাকে দেখে ও বললো “দাদাভাই মরে গেলে কবর দিতে হয়, তাই না? যেমন আম্মাকে দেওয়া হয়েছিলো”। আমি কষ্ট এবং অবাক হয়ে পরে জেনেছিলাম ও আম্মার মৃত্যুর সংবাদ জেনেছিলো আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার সময়েই।

হঠাৎ করেই ও অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডায়রিয়া। খুব নেতিয়ে পড়েছিলো আমার বোনটি। আমি ওর জন্য ডাব চুরি করতে যেয়ে মার খেয়ে ফিরে আসার পর আমার রক্তাক্ত মুখ দেখে বলেছিলো “দাদাভাই খুব ব্যথা লাগে? চল দাক্তালেল কাছে নিয়ে যায়”। আমি ঐদিনি খুব জোরে কেঁদে উঠেছিলাম আমার প্রাণপ্রিয় ছোটবোনটাকে জড়িয়ে ধরে। দুই ভাইবোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ক্ষুদার্ত পেট নিয়ে বসেছিলাম সারা রাতটি ধরে, যেন একে অন্যকে ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো।

শহরে যেয়ে দেখলাম ব্যাঙ্ক খুলেছে আম্মার সই করা ব্যাঙ্কের চেক নিয়ে টাকা উঠাতে যেয়ে শুনলাম যুদ্ধ শেষ। আমাদের আশু শুভসংবাদে খুশি হয়ে উঠেছিলাম। বাজার থেকে কিনেছিলাম চিকন চাল, ওর প্রিয়ফলগুলো। নির্জন বাড়িটাতে এসে দেখি চুপচাপ শুয়ে আছে আমার ছোট্ট প্রিয় বোন প্রায় কঙ্কালসার দেহ নিয়ে। ওকে খুশির সংবাদ আর প্রিয় ফল ধরিয়ে দিয়ে বললাম খেতে থাক এখুনি ভাত রান্ন হয়ে যাবে। তোর প্রিয় মুরগী এনেছি গরম ভাতের সাথে খাবি। ওর মুখে হাসি ফুটে উঠেছিলো কিন্তু হাত দিয়ে খাওয়ার মত শক্তি অবশিষ্ট ছিলোনা। আমি কিছুটা ফল ওর মুখে দিয়ে রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যখন সুঘ্রাণে চারিদিক ময় ময় করছিলো আমি বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিলাম গরম ভাতের তখন আমি চাচ্ছিলাম আমার বোনটাও নিক এই সুঘ্রাণ। ওকে ভিতর থেকে নিয়ে আসতে যেয়ে দেখি ও পড়ে আছে নিথর, ওর ফলগুলো পড়ে আছে পাশেই, কিছু মাছি উড়াউড়ি করছে তার চারপাশে।

আজ আমি ওর কাছে চলে এসেছি মায়ের শেষ কথানুযায়ি ওকে দেখে রাখতে। ও এখনো ছেলেমানুষ। এখনো আমার কাধে ভর দিয়ে ঘুরে বেড়াই আর রাত হলে জোনাকিদের পিছে লাগে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ও নয় যেন জোনাকিগুলো ওর পিছু নিয়েছে।

উৎসর্গঃ যুদ্ধপিড়িত শিশুদের, যাদের কাছ থেকে ক্ষমতালোভি মানুষেরা শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে এবং নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ফুটনোটঃGrave of the Fireflies সিনেমাটা অবলম্বনে।

No comments:

Post a Comment

সেরা

প্রজেক্ট উবামেসেলিস

শুরু আগে ড. নিলান ডাস্টি নিজের সব শক্তি ব্যয় করে দৌড়াচ্ছে । চাঁদের আলোতে পথ দেখতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না । অভ্যাস না থাকার কারনে ...

জনপ্রিয়