Saturday, April 21, 2018

একজন অকুতোভয় সালাম

একাত্তরের ৩ আগস্ট। শেরপুর সীমান্তে নকসি বিওপি-তে পাকিস্তানিদের শক্ত প্রতিরক্ষাব্যুহ। ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর দুই কোম্পানি ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থান দখল করার জন্য আক্রমণ রচনা করবে। আক্রমণের সময় ভোর ৩:৪৫ মিনিট। দুই কোম্পানির মোট ৩০০ জনের মধ্যে ১০ জন নিয়মিত সৈনিক, ৮ জন ইপিআর, ৩ জন পুলিশ। বাকি সবাই সল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ কিশোর, ছাত্র, জনতা – আমাদের গণযোদ্ধা।

আক্রমণের শুরুতে ভারতীয় আর্টিলারীর যে গোলা পড়ার কথা শত্রু অবস্থানের উপর ভুলে সেসব গোলা এসে পড়তে থাকে আমাদের ছেলেদের উপর। শত্রুর কাঁটা তারের প্রতিবন্ধক, মাইন ফিল্ড ডিঙিয়ে ছেলেরা যখন প্রায় শত্রু অবস্থানের উপর উঠে পড়ছে তখন হতাহতের সংখা প্রচন্ডভাবে বাড়তে থাকে। এ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন আমীন দু!বার আহত হয়ে পড়ে যান। আক্রমণ আর পরিকল্পিত রইলো না। এমন সময় শত্রুর এক সৈনিক ক্যাপ্টেন আমীনকে বেয়নেট দিয়ে চার্য করতে এগিয়ে আসে। পাশেই ছিল অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সালাম। শত্রু সেনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মহূর্তেই সালাম তার .৩০৩ রাইফেলের মাথার লম্বা বেয়নেট দিয়ে ওকে এফোড়-ওফোড় করে ফেলে।

এক সুবাদার মেজরের ছেলে সালাম। বর্বর পাকিস্তানি পশুরা তার বাবা-মা, ভাই-বোনদেরনির্মমভাবে তারই সামনে হত্যা করে। স্বজনদের হত্যার এই বিভীষিকা এই কিশোরকে করেছে এক প্রত্যয়ী যোদ্ধা। বহুদিন, বহুবার সালাম ক্যাপ্টেন আমীনকে অনুরোধ করেছে তাকে আক্রমণে নিয়ে যাবার জন্য। এক জীবনে কতো কষ্টের ভার বহন করা যায়? বাবা-মা হারা এই ছোট ছেলেটির বুকের ভেতর কতো গভীর ক্ষত আমীন তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সালামকে বুঝিয়ে আকেরমণে যাওয়া থেকে বিরত রাখতেন। কিন্তু কোনো বাৎসল্যই সালামকে আটকে রাখতে পারেনি। পিছুটানের আর কিছুই ছিল না সালামের এই পৃথিবীতে। তার অন্তরে অপ্রতিরোধ্য প্রতিশোধ স্পৃহা। আক্রমণের আগে সমবেত এলাকায় (Assembly Area) ক্যাপ্টেন আমীন বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন সালাম রাইফেল নিয়ে আক্রমণকারী দলে যোগ দিয়েছে। তাকে দেখেই অন্যান্য ছেলেদের আড়ালে নিজকে লুকাবার চেষ্টা করছিলো। পাছে ক্যাপ্টেন আমীন তাকে আক্রমণে যেতে না দেন। আমীন সব দেখেও কিছু বলেননি।নির্বিকার থেকে সালামের ইচ্ছা পূরণের সম্মতি দিলেন।

বিচ্ছিন্নভাবে হলেও আক্রমণ এগিয়ে যাচ্ছে। শত্রুর অবস্থানের প্রায় পাঁচ গজ কাছে এলে ক্যাপ্টেন আমীনের কনুইয়ে গুলি লাগে। আর এগুনো সম্ভব নয়। শত্রু পিছিয়ে গিয়ে পুনসংগঠিত হয়ে প্রতি-আক্রমণের (Counter Attack) প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাইড রোল করে আমীন তার অসাড় দেহ নিয়ে পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করছেন। ছোটখাটো গড়ন এবং খর্বকায় দেহের ক্যাপ্টেন আমীনের শরীর থেকে অব্যাহত ধারায় রক্ত ঝরছে। শরীর হীম হয়ে আসছে দ্রুত। সালাম সেই থেকেই ক্যাপ্টেন আমীনের পাশে পাশে। হঠাৎ সালাম নিজের রাইফেল ফেলে নিহত যোদ্ধার এলএমজি তুলে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ হুঙ্কার দিয়ে গুলি করতে করতে শত্রু অবস্থানের দিকে একাই দৌড়াতে শুরুকরে। গুলি করছে আর চিৎকার করছে। এই যুদ্ধের মাঠে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে কেউ কিছু শুনছে না। ক্যাপ্টেন আমীন শুনছেন-সালাম চিৎকার করে বলছে, ‘তোরা আমার মা-বাবা,ভাই-বোনদের মেরেছিস, তোরা কী মনে করেছিস আমি তোদের এমনিতেই ছেড়ে দেবো?’ এইটুকুন এই ছেলে সালামই বেয়নেট দিয়ে শত্রু সেনাকে হত্যা করে ক্যাপ্ট্ন আমীনের প্রাণ বাঁচিয়েছে।রক্তস্নাত নির্ভিক আমীন অতিকষ্টে ক্ষীণস্বরে ডাকলেন,’সালাম চলে এসো,সালাম চলে এসো’। সালামের ভ্রুক্ষেপ নেই। হাতে এলএমজি, সামনে পাকিস্তানি পশু,আর ভাবনা নেই, আর ভয় নেই। এখনইতো প্রতিশোধ নেবার সময়। সালাম আর ফেরেনি। প্রাণ ভরে, প্রাণ দিয়ে সালাম তার সব প্রতিশোধ নিয়েছে।



বই- জনযুদ্ধে গনযোদ্ধারা
লেখক - মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া

Wednesday, April 18, 2018

বঙ্গতাজ' ঘোষিত ১৮ নির্দেশনাসমূহ

সাতচল্লিশ বছর পূর্বে আজকের দিনে......

১৯ এপ্রিল ১৯৭১
সোমবার, মাত্র দু'দিন পূর্বে (১৭ এপ্রিল) শপথ নেয়া বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী 'বঙ্গতাজ' তাজউদ্দিন আহমেদ ১৮ টি নির্দেশনা ঘোষণা করেন। তিনি এই নির্দেশনাসমূহ মেনে চলতে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের আপামর জনগণের প্রতি অনুরোধ করেন।



বঙ্গতাজ' ঘোষিত ১৮ নির্দেশনাসমূহঃ
★★★★★★★★★★★★★★★★★★★

১। কোন বাঙালি কর্মচারী শত্রুপক্ষের সাথে সহযোগিতা করবে না। প্রতিটি কর্মচারী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ অনুসারে কাজ করবেন। শত্রু কবলিত এলাকায় অবস্থা বিশেষে বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করবেন।

২। সরকারি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিফৌজকে সাহায্য করবেন।

৩। সকল কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য অবিলম্বে নিকটতম মুক্তিসেনা শিবিরে যোগ দেবেন। শত্রুর সাথে সহযোগিতা করবেন না।

৪। বাংলাদেশ সরকার ছাড়া অন্য কারো বাংলাদেশ থেকে কর, খাজনা ও শুল্ক আদায়ের অধিকার নেই।

৫। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে নৌ চলাচল সংস্থার কর্মচারীরা কোন অবস্থায় শত্রুকে সাহায্য করবেন না।

৬। নিজ নিজ এলাকায় খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদার ওপর লক্ষ্য রাখবেন।

৭। চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারি,মজুতদারির ওপর কঠোর নজর রাখবেন।

৮। ধর্মের দোহাই দিয়ে ও অখন্ডতার বুলি আউড়ে এক শ্রেণীর দেশদ্রোহী মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এদের চিহ্নিত করে রাখুন। এদের সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করুন। তাদের মুক্তিফৌজদের হাতে অর্পণ করুন।

৯। গ্রামে গ্রামে রক্ষীবাহিনী গড়ে তুলুন এবং রক্ষীবাহিনীর সেচ্ছাসেবকদের মুক্তিবাহিনীর নিকটতম ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।

১০। শত্রুপক্ষের গতিবিধির খবর সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে জানাবেন।

১১। মুক্তিবাহিনীর চলাচলের জন্য চাহিবামাত্র সরকারি যানবাহন হস্তান্তর করতে হবে।

১২। বাংলাদেশ সরকার বা মুক্তিবাহিনী ছাড়া জ্বালানী বিক্রি করা চলবে না।

১৩। কেউ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অথবা তাদের এজেন্টদের সাহায্য করবে না। যে করবে তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

১৪। গুজবে কান দেবেন না। চূড়ান্ত সাফল্য সম্পর্কে নিরাশ হবেন না।

১৫। সকল সুস্থ ও সবল ব্যক্তিকে নিজ নিজ আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিকটতম মুক্তিবাহিনী শিবিরে রিপোর্ট করতে হবে।

১৬। শত্রুবাহিনীর ধরা পড়া কিংবা আত্মসমর্পণকারী সৈন্যকে মুক্তিবাহিনীর কাছে সপর্দ করতে হবে।

১৭। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সকল প্রকার যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হতে পারে সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এবং

১৮। তথাকথিত পাকিস্তান বেতারের মিথ্যা প্রচারণা আদৌ বিশ্বাস করবেন না।

ছবিঃ একাত্তরে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের (প্রবাসী ও মুজিবনগর খ্যাত) দুই কাণ্ডারি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ।

Monday, February 12, 2018

ইশতেহার মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশবাসীর প্রতি মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে কাদের সিদ্দিকি ( বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র – একাদশ খণ্ড থেকে )

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

ঢাকা টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ ও পাবনা জেলা বেসামরিক দপ্তর

|| ঈশতেহার ||



প্রিয় দেশবাসী:



আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের জানাচ্ছি পবিত্র মাহে রমজানের মোবারকবাদ। সম্প্রতি মুজিবনগর থেকে ফিরে আসার পর আমার সামনে নতুন কতগুলো সমস্যা এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সমস্যার আলোকে আমি আপনাদের কাছে মুক্তিবাহিনীর তরফ থেকে নির্দেশ দিচ্ছি।



১ ) আপনারা যারা দেশকে ভালবাসেন কিন্তু জালেম দস্যু বিদেশী সৈন্যদের আওতায় আছেন তারা যেভাবে পারেন বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করুন প্রয়োজন হলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন । আমরা আপনাদের সাথে আছি।



২ ) যারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরিপন্থী কাজ করছেন কিন্তু পরবর্তী বাস্তবতা বুঝতে পেরে বিবেকের দংশনে নিজেদের অপরাধ বুঝতে পেরেছেন তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। যত অন্যায় ই করে থাকুন আমরা সহানুভূতির সঙ্গে তা বিবেচনা করব।



৩) যারা এখনো সরকারী চাকুরি করছেন তারা নিজ নিজ স্থান থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করে যান এবং উপযুক্ত সময়ে মুক্তিবাহিনীর নির্দেশে আপনারা এক যোগে কাজ থেকে সরে পরবেন।



৪) বাংলাদেশের কৃষক শ্রমিক চাকুরীজীবী প্রত্যেকেই যেভাবে পারেন আমাদের সাহায্য পৌছে দিন।



৫ ) যারা রাজাকারে ভর্তি হয়েছেন তাদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ আপনারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করে একযোগে আমাদের সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনে শরীক হন।



৬ ) স্বেচ্ছায় যে কোন আত্মসমর্পণকারীর সঙ্গে সম্মানজনজক ব্যবহার করা হবে।



৭ ) লাইসেন্সসহ প্রতি মণ পাটের জন্য এক টাকা খাজনা দিয়ে যে কোন দিকে পাট বহন করার অনুমতি পাবেন।



৮ ) জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে নির্দেশ হল ২৫ শে মার্চের আগে যে জমি যার দখলে ছিল তারই থাকবে।



৯ ) ( ক) পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন করে রিজার্ভ ভাঙ্গা চলবে না।




(খ) যে সমস্ত জমি চার বতসর আগে বানানো হয়েছে সেগুলো এখন আবাদযোগ্য তবে জমিতে গাছ থাকলে গাছের পাতাও কাটা চলবে না।




(গ) চার বছর আগে যারা রিজারভ ভেঙ্গেছেন এবং একেবারে নিঃসম্বল দরিদ্র ঘরবাড়িসহ পাঁচ বিঘে জমি তাদের বহাল থাকবে।



আশা করি উপরোক্ত নির্দেশাবলি আপনারা মেনে চলবেন।


খোদা হাফেজ। জয় বাংলা।



স্বাঃ কাদের সিদিকী

২৪-১০-৭১


সেরা

প্রজেক্ট উবামেসেলিস

শুরু আগে ড. নিলান ডাস্টি নিজের সব শক্তি ব্যয় করে দৌড়াচ্ছে । চাঁদের আলোতে পথ দেখতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না । অভ্যাস না থাকার কারনে ...

জনপ্রিয়