আক্রমণের শুরুতে ভারতীয় আর্টিলারীর যে গোলা পড়ার কথা শত্রু অবস্থানের উপর ভুলে সেসব গোলা এসে পড়তে থাকে আমাদের ছেলেদের উপর। শত্রুর কাঁটা তারের প্রতিবন্ধক, মাইন ফিল্ড ডিঙিয়ে ছেলেরা যখন প্রায় শত্রু অবস্থানের উপর উঠে পড়ছে তখন হতাহতের সংখা প্রচন্ডভাবে বাড়তে থাকে। এ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন আমীন দু!বার আহত হয়ে পড়ে যান। আক্রমণ আর পরিকল্পিত রইলো না। এমন সময় শত্রুর এক সৈনিক ক্যাপ্টেন আমীনকে বেয়নেট দিয়ে চার্য করতে এগিয়ে আসে। পাশেই ছিল অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সালাম। শত্রু সেনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মহূর্তেই সালাম তার .৩০৩ রাইফেলের মাথার লম্বা বেয়নেট দিয়ে ওকে এফোড়-ওফোড় করে ফেলে।
এক সুবাদার মেজরের ছেলে সালাম। বর্বর পাকিস্তানি পশুরা তার বাবা-মা, ভাই-বোনদেরনির্মমভাবে তারই সামনে হত্যা করে। স্বজনদের হত্যার এই বিভীষিকা এই কিশোরকে করেছে এক প্রত্যয়ী যোদ্ধা। বহুদিন, বহুবার সালাম ক্যাপ্টেন আমীনকে অনুরোধ করেছে তাকে আক্রমণে নিয়ে যাবার জন্য। এক জীবনে কতো কষ্টের ভার বহন করা যায়? বাবা-মা হারা এই ছোট ছেলেটির বুকের ভেতর কতো গভীর ক্ষত আমীন তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সালামকে বুঝিয়ে আকেরমণে যাওয়া থেকে বিরত রাখতেন। কিন্তু কোনো বাৎসল্যই সালামকে আটকে রাখতে পারেনি। পিছুটানের আর কিছুই ছিল না সালামের এই পৃথিবীতে। তার অন্তরে অপ্রতিরোধ্য প্রতিশোধ স্পৃহা। আক্রমণের আগে সমবেত এলাকায় (Assembly Area) ক্যাপ্টেন আমীন বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন সালাম রাইফেল নিয়ে আক্রমণকারী দলে যোগ দিয়েছে। তাকে দেখেই অন্যান্য ছেলেদের আড়ালে নিজকে লুকাবার চেষ্টা করছিলো। পাছে ক্যাপ্টেন আমীন তাকে আক্রমণে যেতে না দেন। আমীন সব দেখেও কিছু বলেননি।নির্বিকার থেকে সালামের ইচ্ছা পূরণের সম্মতি দিলেন।
বিচ্ছিন্নভাবে হলেও আক্রমণ এগিয়ে যাচ্ছে। শত্রুর অবস্থানের প্রায় পাঁচ গজ কাছে এলে ক্যাপ্টেন আমীনের কনুইয়ে গুলি লাগে। আর এগুনো সম্ভব নয়। শত্রু পিছিয়ে গিয়ে পুনসংগঠিত হয়ে প্রতি-আক্রমণের (Counter Attack) প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাইড রোল করে আমীন তার অসাড় দেহ নিয়ে পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করছেন। ছোটখাটো গড়ন এবং খর্বকায় দেহের ক্যাপ্টেন আমীনের শরীর থেকে অব্যাহত ধারায় রক্ত ঝরছে। শরীর হীম হয়ে আসছে দ্রুত। সালাম সেই থেকেই ক্যাপ্টেন আমীনের পাশে পাশে। হঠাৎ সালাম নিজের রাইফেল ফেলে নিহত যোদ্ধার এলএমজি তুলে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ হুঙ্কার দিয়ে গুলি করতে করতে শত্রু অবস্থানের দিকে একাই দৌড়াতে শুরুকরে। গুলি করছে আর চিৎকার করছে। এই যুদ্ধের মাঠে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে কেউ কিছু শুনছে না। ক্যাপ্টেন আমীন শুনছেন-সালাম চিৎকার করে বলছে, ‘তোরা আমার মা-বাবা,ভাই-বোনদের মেরেছিস, তোরা কী মনে করেছিস আমি তোদের এমনিতেই ছেড়ে দেবো?’ এইটুকুন এই ছেলে সালামই বেয়নেট দিয়ে শত্রু সেনাকে হত্যা করে ক্যাপ্ট্ন আমীনের প্রাণ বাঁচিয়েছে।রক্তস্নাত নির্ভিক আমীন অতিকষ্টে ক্ষীণস্বরে ডাকলেন,’সালাম চলে এসো,সালাম চলে এসো’। সালামের ভ্রুক্ষেপ নেই। হাতে এলএমজি, সামনে পাকিস্তানি পশু,আর ভাবনা নেই, আর ভয় নেই। এখনইতো প্রতিশোধ নেবার সময়। সালাম আর ফেরেনি। প্রাণ ভরে, প্রাণ দিয়ে সালাম তার সব প্রতিশোধ নিয়েছে।

বই- জনযুদ্ধে গনযোদ্ধারা
লেখক - মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া
No comments:
Post a Comment