Thursday, February 2, 2017

প্রলাপ

- আম্মু এই মানুষটা এমন কেন?
- বাবা কাছে যেয়ো না...ও মানুষ না...পাগল!!

মা ছেলের কথা শুইন্যা অনেক কষ্টে একটু চোখ মেইলা দ্যাখলাম। স্কুলডেরেস পইরা একটা চার পাঁচ বছরের ছুট্টু ছেলে মায়ের সাথে হাইটা যাইতাছে। গলির মাথায় স্কুলের মর্নিংশিফট মনে হয় শ্যাষ; তার মানে এগারটা বাইজা গ্যাছে। ঘুম আগেই ভাঙ্গছে; শীতের সকালের রোদ গায়ে পড়লে ঘুমাইতে খুবই আরাম। 

মাথার এই বেজন্মা উকুন গুলির জ্বালায় ঘুম নষ্ট। রোদের তাপে মাথা জুইড়া এমন কামড়াকামড়ি লাগায় যে ঘুমানো কঠিন। মাথাডা আরাম কইরা চুলকাইতেও পারি না; লম্বা চুলে এমুন জট লাগছে যে আঙ্গুল দেয়া যায় না। সেদিন রাস্তা থেইক্যা একটা আইসক্রীমের কাঠি যোগাড় করেছিলাম। কই যে গেলো? 

এইইই তো...উহহহ মাথা চুলকাইতে যে কি আরাম!!! শালা এই উকুন গুলা আমার রক্তে খাইয়া যে কি মজা পায় কে জানে? বেশীর ভাগ দিনতো তিনবেলা খাওয়াই জুটে না...রক্তে কুন ভাইটামিনতো পাওয়ার কথা না। তবে যাদের রক্ত চোষার অভ্যাস তারা আমার মতো গরীব মানুষের রক্তই বেশী বেশী খায়!!! উকুনের আর কি দোষ? 

মাথাটা কামায়ে ফেলতে পারলে ভালো হইতো; উকুনের জ্বালায় আর ভালা লাগে না। শীতটা কমলেই মাথা বেল কইর‍্যা ফেলমু। চুল কেন...মাঝে মাঝেতো ইচ্ছা করে মাথাটাই কাইট্যা ফেলতে। এখুনতো শুনি চুলকাটার জইন্য নাপিতের মতো মাথা কাটার জইন্যও লোক পাওয়া যায়। তবে পাগলের মাথার আর কি দাম? দামী মাথা হইলে নিশ্চয়ই কাটার জইন্য লোকে এমনিতেই আয়া পড়তো। 

আজ কি খাওয়া পামু কিনা কে জানে? মসজিদের সামনে অবশ্য খাবার আর ভিক্ষা না চাইতেই পাওয়া যায়। রাস্তার ওই পাশেই মসজিদ; মসজিদের নামাজের জায়গা বাড়াইতাছে। বৃষ্টির মওসুম থেইকাই ইটা বালু রড সুরকি আইন্যা আশেপাশে ফালাইয়া রাখছে। ভালোই করছে; ইটের পাজার ওপরে এই ঠাণ্ডায় একটু আরাম কইরা ঘুমানো যাইতাছে।

এই জায়গাতে ফকিরের আসাযাওয়াও বেশী, বিশেষ কইরা শুক্রবারে জামাতের দিনে। ভিক্ষুকরা জায়গা নিয়া ক্যাচাল করলেও আমারে কেউ ঘাটায় না...পাগল হইবার এই এক সুবিধা!!! তবে মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। আগে আমার সাথে এইখানে আরেকটা পাগলও থাকতো। ব্যাটা সারাদিন বিড় বিড় কইরা বলতো “আম জা্ম আম জাম”; কে জানে ক্যান? আম জাম না খাইতে পাইয়া পাগল নাকি ফরমালিন দেয়া আম জাম খাইয়া পাগল কে জানে!! আর জানমুই বা ক্যামনে? সে খালি বলে “আম জাম” আর আমারতো কথাই বন্ধ। “আম জাম” মাঝে মাঝেই চৌরাস্তার মোড়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতো; বেশ ভালোই করতো; জ্যাম থাকলেও ছুইট্যা যাইতো। একদিন কোত্থনে পুলিশ আইস্যা ধইরা লইয়া গেলো। আরে বেকুব ঠোলারা...এই শহরে সব রিক্সা গাড়ী যখন পাগলের মতো চলে তখন পাগলের চেয়ে ভালো ট্রাফিক কন্ট্রোল আর কে করতে পারে? 

ধুর!!! হাসি পাইতাছে যে...হা হা হা!!! আচমকা হাইসা উঠতেই দুজন পথচারী লাফ দিয়া সইরা গেলো। হা হা হা!!! এদের দেখি ভয়ে চোখ মুখ শুকায়ে গ্যাছে; ব্যাটাদের ভয় দেইখ্যা আরো বেশী হাসি আসতেছে...পাগলের চীৎকারের চাইয়া যে পাগলের হাসি বেশী ডরাওলা তা আমি জানি...ক্যান কে জানে? আমিতো কখনো কাউরে বকি নাই, তাড়াও করি নাই। শুধু আমার কথা কইতে ইচ্ছা করে না, খুবই ক্লান্ত লাগে, মনে হয় কথা কইয়া কি হবে? কুন মানে নাই যে...অর্থহীন!!! পাগলে কি না কয় আর ছাগলে কি না খায়?

তবে কাউরে তাড়া করি নাই এই কথাও পুরাপুরি ঠিক না। মামারে বটি নিয়া তাড়া করালাম বইলাইতো লঞ্চে কইরা গেরাম থেইকা এই শহরে রাইখা গেলো। তাড়া করুম না? মামা্রে আইসা লোকমান মিয়া বলে “আহারে পুলাটার জবান এখুনো বন্ধ...কি মনে হয়? আর কথা কইবো না?” মামা কিনা তারে কয় “আর কইয়ো না...এই গোলমালের সুময় আমার বুন, বুন জামাইরে এত্তটুক ছেলের সামনে কুপাইয়া মারছে...ভয়ে কথা বন্ধ মনে হয়।“ “গোলমাল” কথাটা শুইনাই আমার মাথাটা গরম হয়া গেলো; আব্বা সবসময় গ্রামের সবাইরে বলতেন “খবরদার!! গোলমাল বলবা না, মুক্তিযুদ্ধ বলবা। এখন আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ চলতেছে।“ মামী উঠানে বটি দিয়া রান্নার কাটাবাছা করতেছিলেন। আর কিছু না পাইয়া সেইটা নিয়াই মামারে দৌড়ানি দিলাম; খালে নিয়া ফেলছিলাম।

হা হা হা!!! মামার চেহারাটা মনে কইরা আবারো হাসি আসতেছে। তবে মামা মামী এমনিতে অনেক আদর করতো। আরেকবার যে কুদ্দুস মিয়ারে দা নিয়া তাড়া করছিলাম তখন কিন্তু গ্রামের লোকে বললেও মামা মামী ঘর থেকে বাইর কইরা দেয় নাই। কুদ্দুস মিয়া!!! মনে কইরাই আবার মাথাটা আউলা হইয়া যাইতাছে। সে কি ভাবছে আমি দেখি নাই, আমি জানি না। পাকসেনাদের আমাদের বাসায়তো সেই নিয়া আসলো; মা বলাতে আমি তাড়াতাড়ি শোয়ার ঘরের আলমারিতে লুকাইলাম। 

অনেক আগে আমাদের গেরামে একটা গরু মরছিলো; আর শকুনের দল কুথা কুথা থেইকা আইসা মরা গরুটার ওপরে হামলায়ে পড়ছিলো। বিছানায় মায়ের ওপরে ওই পাকিস্তানী মিলিটারীরা ঠিক তেমনি হামলায়ে পড়ছিলো; ছিঁড়া খুইড়্যা খাওয়া শ্যাষে বেয়োনেট দিইয়া খুঁচায়া খুঁচায়া মায়েরে মারলো। বাবারে শোয়ার ঘরেই চেয়ারের সাথে বাইন্ধ্যা রাখছিলো; মাঝে মাঝে রাইফেলের বাট দিয়া মারতেছিলো। বাবা মা প্রথমদিকে চীৎকার করতেছিলেন কিন্তু একটু পরে দুইজনেই চুপ কইরা গেলেন। আমি জানি ক্যান? আমি জানিইইইই...প্রান ভিক্ষা চাইলে কাকুতি মিনতি করলে ওই বেজন্মাগুলার আনন্দ আরও বাইড়া যায়। ভয় যদি চোখে না দেখা যায়, কাকুতি যদি শোনা না যায়, তবে অত্যাচারের মজা কই? 

আমি নিজের মুখ নিজে চাইপা ধইরা ছিলাম; চীৎকার যেন না হয়!!! মা আগেই বইলা দিছিলো। মা আর বাবারে মারার পরে সেই কুদ্দুস মিয়া সারা বাড়ী আমারে খুঁজছে; না পায়া শ্যাষে ভাবছে আমি বুঝি বাসায় নাই। হা হা হা!!! শালা বাঞ্চোত ভাবছে আমি জানি না, আমি দেখি নাই। 

ব্যাটা হারামীর বাচ্চা মামারে আইস্যা বলে “মাসুম বাচ্চাটার এই দশা কে করলো? কথা বন্ধ...আহারে” সাথে আবার শালা চুক চুক আওয়াজও করে। দিলাম দা নিয়া দৌড়ান; প্রথমে যখন তার কাছে দা পিছুনে লুকাইয়া আউগাইছি সে বুঝে নাই...হাসিমুখে বলে “কেমুন আছো বাজান?” যখন দা দিয়া কোপ দিতে নিছি সে “ওরে বাবারে মারে...আমারে মাইরা ফেললো রে” কইয়া দৌড়...পিছে পিছে আমিও দৌড়। ব্যাটার চেলা চামুন্ডারা অবশ্য মাঝ রাস্তাতেই আমারে কব্জা করে ফালাইছিলো.....যত্তোসব!! মজাই নষ্ট!!! ইশশ রে এই একটা কারনেই গেরাম ছাইড়া আসার জন্য আফসুস হয়...গেরামে থাকলে মাঝে মাঝে কুদ্দুস আর তার মতো রাজাকারগো দৌড়ানি দিতে পারতাম। আমি ছাড়াতো গেরামে সব সুস্থ মানুষ; পাগল ছাড়া রাজাকারগো এই দ্যাশে কেউ দৌড়ানি দেয় না যে!!!

আমি কথা কই না সেই কবে থেইকা...কত্তোদিন হয়া গেলো দ্যাশ স্বাধীন হইলো...কিন্তু আসলেই কি হইলো? তাইলে কুদ্দুস মিয়ার মতো পশুগুলা বাইরে মুক্ত ঘুরে ক্যামনে? আমারে না কেউ জিগায় নাই সেইদিন কে আমার বাবা মারে মারছিলো? যে দিন কেউ আমারে জিগাবে সেই দিন আমি কথা কমু...কিন্তু আমারে কেউ জিজ্ঞাসা করে না ক্যান? সবাই কি তাইলে সব জানে? আর জাইনাও না জানার ভান করে? দ্যাশের মানুষগুলা কবে আমার মতোন পাগল হবে?

No comments:

Post a Comment

সেরা

প্রজেক্ট উবামেসেলিস

শুরু আগে ড. নিলান ডাস্টি নিজের সব শক্তি ব্যয় করে দৌড়াচ্ছে । চাঁদের আলোতে পথ দেখতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না । অভ্যাস না থাকার কারনে ...

জনপ্রিয়